শ্যামনগর (সাতক্ষীরা) প্রতিনিধিঃ জি এম রাজু আহমেদ
যথাযোগ্য মর্যাদা, গভীর শ্রদ্ধা এবং উৎসবমুখর পরিবেশে সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলায় উদযাপিত হয়েছে ২৬ মার্চ ৫৬তম মহান স্বাধীনতা দিবস-২০২৬। দিনব্যাপী নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়।
দিবসের সূচনায় সকাল ৮টায় শ্যামনগর উপজেলা প্রশাসন ও মাননীয় সংসদ সদস্যের পক্ষ থেকে কেন্দ্রীয় শহীদ স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে কর্মসূচির শুভ সূচনা হয়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা গাজী নজরুল ইসলাম, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামসুজ্জামান কনক, সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোহাম্মদ রাশেদ হোসাইনসহ প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তাবৃন্দ।
এ সময় বীর মুক্তিযোদ্ধারাও শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। পরে পর্যায়ক্রমে শ্যামনগর থানা পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ইউনিট, উপজেলা প্রেসক্লাব, উপজেলা রিপোর্টার্স ক্লাব, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠনসমূহ শহীদদের স্মরণে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করে।
এরপর বীর মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণে মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতিস্তম্ভে মাল্যদান করা হয় এবং বীর শহীদদের কবর জিয়ারত ও দোয়া-মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়। এতে অংশ নেন সংসদ সদস্য, উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, সাংবাদিক এবং সর্বস্তরের সাধারণ মানুষ।
পরে শ্যামনগর সরকারি হরিচরণ পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে অনুষ্ঠিত হয় বর্ণাঢ্য কুচকাওয়াজ ও মনোজ্ঞ ডিসপ্লে অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামসুজ্জামান কনক এবং প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) রাশেদ হোসাইন, থানার অফিসার ইনচার্জ খালিদুর রহমান, উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. জিয়াউর রহমান, উপজেলা রিপোর্টার্স ক্লাবের সেক্রেটারি ইয়াসিন আরাফাতসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।
অনুষ্ঠানের শুরুতে শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। জাতীয় সংগীতের সুরে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। এরপর শ্যামনগর উপজেলার বীর মুক্তিযোদ্ধাদের উপজেলা প্রশাসন ও প্রধান অতিথি বীর মুক্তিযোদ্ধা গাজী নজরুল ইসলাম ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান, যা অনুষ্ঠানে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি করে। পরে সাদা পায়রা ও বেলুন উড়িয়ে দিবসটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা করা হয়।
এরপর শুরু হয় কুচকাওয়াজ প্রদর্শনী। এতে অংশগ্রহণ করে শ্যামনগর থানা পুলিশ, আনসার ও ভিডিপি বাহিনী, ফায়ার সার্ভিস ইউনিট এবং উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। পরে শিক্ষার্থীদের পরিবেশিত মনোমুগ্ধকর ডিসপ্লে উপস্থিত দর্শকদের মুগ্ধ করে এবং পুরো মাঠজুড়ে সৃষ্টি হয় উৎসবের আমেজ।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম বলেন, ১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়েই অর্জিত হয়েছে আমাদের প্রিয় স্বাধীনতা। তিনি বলেন, ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রদান করা হলে জাতি স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে। দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত হয় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ।
তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধে আত্মদানকারী শহীদদের রুহের মাগফেরাত কামনা করেন এবং জীবিত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন। পাশাপাশি তিনি বলেন, স্বাধীনতার ৫৬ বছরের পথচলায় দেশ নানা চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করেছে। ২০২৪ সালের আগস্টে সংঘটিত স্বৈরাচার পতন আন্দোলনের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। এ সময় তিনি ওই আন্দোলনে শহীদদের রুহের মাগফেরাত কামনা করেন এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে অবদান রাখা সকলের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
সভাপতির বক্তব্যে শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামসুজ্জামান কনক বলেন, মহান স্বাধীনতা দিবস আমাদের জাতীয় জীবনের এক গৌরবময় অধ্যায়, যা বাঙালি জাতির আত্মত্যাগ, সাহস ও ঐক্যের প্রতীক। তিনি বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অবদানের কথা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে বলেন, তাদের ত্যাগের বিনিময়েই আজকের স্বাধীন বাংলাদেশ। নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, দেশপ্রেম, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধে উজ্জীবিত হয়ে সবাইকে দেশের উন্নয়নে কাজ করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করে একটি সমৃদ্ধ, আধুনিক ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে। এজন্য সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সততা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে তিনি শহীদদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করেন এবং বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করেন।
সার্বিকভাবে মহান স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে শ্যামনগর উপজেলাজুড়ে ছিল দেশাত্মবোধ, আবেগ ও গৌরবের এক অনন্য আবহ, যা নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত করবে—এমনটাই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।